Saturday, November 8, 2008

পরিবেশ কথাটির জনমানসে বিস্তার বিশ শতকের মাঝামাঝি থেকে । তাও বিশেষ করে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে পারমাণবিক বিস্ফোরণের পর । কিন্তু সেই ধারণা অনেকটাই ভাসা ভাসা। পরিবেশ যে আধার, আর তা ধারণ করে আছে মানুষ তার খাদ্য, জলবায়ু, জীবনধারণের সব উপকরণসহ – এত সব একসঙ্গে জনসাধারণের মধ্যে আসেনি । আজও কতটা এসেছে সে সম্বন্ধে সন্দেহ হয় যখন দেখি মহানগরীর পথঘাটের আনাচে কানাচে আবর্জনার স্তূপ, কাজের দিনের ব্যস্ততম সময়ে তা পরিষ্কার করতে ট্রাক এসেছে উষ্ণদেশের গ্রীষ্ম বর্ষার পচনশীল আবহাওয়ায় তৈরি এস্টারের গন্ধ ছড়িয়ে আর আরশোলা থেকে মশা মাছি আর বিষাক্ত কীট পতঙ্গের ঝাঁক মুক্ত করে ।
ভাবার কোনো কারণ নেই যে এটা শুধু কলকাতা বা ভারতের নাগরিক সমস্যা । প্রধান প্রধান রাস্তায় উপরের তলা থেকে জঞ্জাল নিকাশের তাৎক্ষণিক ও অনায়াস পদ্ধতি নিচে ফেলে দেবার প্রবণতা কলকাতার মত আরো অনেক নগরে আছে, তবে হয়তো অপ্রধান পথঘাটে; আছে লন্ডনের গলিঘুঁজিতে, তবে কমে এসেছে একমাত্র মার্কিন মুলুকে রেড ইন্ডিয়ানদের সংরক্ষিত এলাকা ছাড়া । কলকাতার ধুঁয়াশা বা ‘স্মগ’ লস এঞ্জেলিসের স্মগের তুলনায় শিশু ।
বিজ্ঞানের সীমাবদ্ধতা সম্বন্ধে সচেতনতা অনেক পরের, তাও সীমিত জনের মধ্যে । ধর্মীয় সংকীর্ণতার মতই জনমানসে বিজ্ঞানের অজুহাতে যে সংকীর্ণতা তার অনেকটাই এখনও মননশীল মানুষের বোধের অগম্য । তাই কুইনিনের জায়গায় পেনিসিলিন, অরোমাইসিন, ক্লোরোমাইসিটিন তারপর অ্যাম্পসিলিন কেন এল তা অনেকেরই অজানা । কেন ম্যালেরিয়া, বসন্ত, পোলিও নির্মূল হবার পর আবার এল আরও মারমুখী রূপে, তাও স্পষ্ট নয় । জনমানসে গাছের প্রয়োজনীয়তা যে শুধু অক্সিজেন ছাড়ার জন্য নয়, ভাইরাস নামের বিষগুটি বিপাকের স্বয়ংক্রিয় আত্তীকরণের কর্তারূপেও, তার কোনো আভাস নেই ।
পাশাপাশি তো আছেই মানুষের অবিচনায় প্রাকৃতিক সম্পদের দ্রুত ক্ষয়, জল, মাটি, বাতাসের মত পূরণযোগ্য রসদের অবক্ষয় । সব দেশে বিভিন্ন পাঠ্যক্রমে পরিবেশ বিচিন্তা আবশ্যিক হলেও তা ছাত্রদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ । সাধারণ্যে অনেকে বিশ্বাস করেন ‘ধূমায়তে বহ্নি’, কিন্তু সব ধূমই যে অগ্নির ইংগিত দেয়না তা মনে রাখেননা । সেই জনমানসকে সচেতন করার প্রয়াস ‘প্রকৃতির প্রথম সন্তান’ ।

পুরোভাষ
উনিশ শতকের মাঝামাঝি প্রকাশিত আঙ্ক্‌ল্‌ টম্‌স্‌ কেবিন ঘৃণ্য দাস প্রথা সম্বন্ধে শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উত্তরের প্রদেশগুলিতে নয় আটলান্টিকের অপর পারে সুদূর প্রাচ্যের ভারতেও ছড়িয়ে পড়েছিল। প্রায় একই সময়ে কোনো দায়িত্বশীল আমেরিকান নাগরিকের চোখে পড়ে নির্বিচার পশুচারণে কীভাবে মরুভূমি পশ্চিমের রাজ্যগুলি থেকে পূর্বের রাজ্যগুলির দিকে আগ্রাসী প্রভাব বিস্তার করছে । বিষয়টি মার্কিন কংগ্রেসের নজরে আনতে একই সঙ্গে আরও কতকগুলি বিষয়ে চোখ পড়ল । শিল্পবিপ্লবের অবধারিত ফলরূপে গ্রাম থেকে নগরে মানুষের ঢল, সঙ্গে তাদের অপরিচ্ছন্ন জীবনচর্যা, খোলা জায়গার আয়তন হ্রাস, মুক্ত বাতাস ও অমলিন জলের ক্রমবর্ধমান অভাব এসবও হল কংগ্রেসের বিতর্কের বিষয় । ১৮৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত হল প্রথম জাতীয় উদ্যান ইয়েলোস্টোন । প্রকৃতি এবং পরিবেশ সংরক্ষণের এটিই প্রথম পদক্ষেপ ।
সেই থেকে পরিবেশের বিভিন্ন দিক নিয়ে ইতস্তত বিক্ষিপ্ত আন্দোলন হলেও তেমন কোনো ঐকান্তিক চেষ্টা চোখে পড়েনা সাধারণ মানুষকে পরিবেশ সম্বন্ধে সচেতন করার, বা পরিবেশের প্রতি তাদের আচরণ শুধরানোর । বেসরকারি সংস্থাগুলি তখমও সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে উঠতে পারেনি পরিবেশের সমস্যাগুলির প্রতি নিয়মিত লক্ষ্য রাখার বা কেউ তার প্রতি অন্যায় আচরণ করলে তার যথোপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা করার অভাবে। পরিবেশ দূষণ নামে অধুনা অতি পরিচিত বাক্যাংশ তখনও আসেনি । কিন্তু অনেকে দেখেছেন যে এক ফোঁটা কালি যেমন শুকনো ব্লটিং পেপারে দ্রুত বহুদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে যায় তেমনি পরিবেশে কোনো বিঘ্ন ঘটলে তা একটি ছোট কেন্দ্রক থেকে চারিদিকে ছড়িয়ে যেতে দেরি হয়না । মহাযুদ্ধ বিশেষ করে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে শস্যক্ষেত্রের, বনভূমির, জলাভূমির ব্যাপক ক্ষতি আর পাশাপাশি প্রযূক্তিবিদ্যার দ্রুত উন্নতি ঘটে গেল । প্রযুক্তিবিদ্যা এনে দিল ক্ষতিগ্রস্ত ভূমির দ্রুত পুনরুদ্ধারের সুযোগ, খাদ্যের উৎপাদন বৃদ্ধি, চিকিৎসা ও অস্ত্রচিকিৎসার ক্ষেত্রে যুগান্তকারী উন্নতি । জন্মের হার বেড়ে চলা আর ক্রমহ্রাসমান মৃত্যুর হার ১৯৫০ সালে পৃথিবীর ২,৫৫৫,৯৮২,৬১১ জনসংখ্যাকে ২০০০ সালে এনে তুলল ৬,০৮১,০০২,৯৩৭-এ । আর তা বেড়েই চলেছে গুণোত্তর হারে । খাদ্যের বৃদ্ধি তো তার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ রাখতে হবে, তাই বেড়ে চলল কীটনাশক আর কৃত্রিম সারের ব্যবহার । শুরুতে বোঝা যায়নি খাদ্যের পুষ্টিগুণ কী হারে কমে যাচ্ছে।
আঙ্ক্‌ল্‌ টম্‌স্‌ কেবিনের মত এযুগের তীব্র অভিঘাত রাশেল কার্সনের Silent Spring গ্রন্থের ১৯৬২ সালে । উপন্যাসের আঙ্গিকে রচিত এই বইটিতে দেখানো হল কীভাবে প্রাণচঞ্চল বসন্তকাল স্তব্ধ হয়ে গেছে কীটনাশকের ব্যবহারে । সেই উপন্যাসের রঙ্গমঞ্চে বসানো হয়েছে আমেরিকার বিভিন্ন স্থানের পরিবেশের সমস্যাগুলি, নাটকীয় ভাবে এসেছে একের পর এক অধ্যায়গুলি। নামের নমুনা দিয়ে তার পরিচয় এরকম : A fable for Tomorrow, The Obligation to Endure, Elixir of Death, Suraface Waters and Underground Seas .. ইত্যাদি । তার পর দলে দলে এল গ্যারেট হার্ডিনের The Tragedy of the Commons (১৯৬৮), পল এহ্‌রলিশের The Population Bomb (১৯৬৮), ডোনেলা এইচ মেডোর The Limits to Growth (১৯৭২)। এগুলি সরকারি সংস্থাগুলির প্রতি পরিবেশবিদদের তথাকথিত রহস্য উন্মোচক বা জীবনমূলক সাহিত্যের আহ্বান পরিবেশের ক্ষতিকারক মানুষের ক্রিয়াকলাপের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেবার । ১৯৭৪ সালে এল রবার্ট হেইলবোর্নারের An Inquiry into the Human Prospect । প্রতিপক্ষও কমজোরি নয়, ১৯৮৪ সালে এল কুলিয়ান সাইমন আর হার্মান কানের The Resourceful Earth । তাঁদের বক্তব্য মানুষের এতই ক্ষমতা যে তারা তাদের সব ক্ষমতার সদ্ব্যবহার করে যথাসময়ে সব ব্যবস্থা করে ফেলবে ।
সব গ্রন্থই প্রচুর পাঠক পেল, কতক্তগুলি আঞ্চলিক ক্লাবগুলি আসন্ন পরিবেশীয় সংকট নিয়ে যে প্রচার শুরু করল তা ক্রমশ আন্তর্জাতিক সাড়া জাগাল । তা সত্ত্বেও পাঠ্যক্রমের বাহিরে থেকে গেল অনেকে যাদের কাছে পরিবেশ রয়ে গেল অধরা, কিংবা অজ্ঞেয় । অনেকে তো বুঝে উঠতে পারেননা পরিবেশ বিদ্যা বিজ্ঞান না দর্শনের একটি কল্পনা বা অনুভূতি মাত্র। কারণ তাঁরা বাল্যকাল থেকে জেনে এসেছেন যে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি শুধু সেই পদ্ধতি যা জ্ঞান আহরণ করে পরিমাপন, পূর্বাভাস আর তা যাচাই করার মাধ্যমে । বা পরীক্ষণ, পর্যবেক্ষণ ও অনুমানের পর্য়ায়ক্রমে পরিবেশের অনুসন্ধানে কোথায় সেই সব ধাপ, কোথায় পরীক্ষণ, কোথায়ই বা পর্য়বেক্ষণ, অনুমান থাকলেই বা! এর পাশাপাশি আবার এক ধরনের মানুষ ভাবতে শুরু করলেন পরিবেশ একটি প্রাণী, শুধু প্রাণীই নয় তা মননশীলও বটে । তাকে বিপন্ন করলে সেও উচিত শিক্ষা দিতে ছাড়েনা । যত দিন এগোচ্ছে ততই এই সব মানুষ দলে ভারি হচ্ছেন । এঁদের মধ্যে যেমন আছেন সাধারণ মানুষ তেমনি আছেন পরিবেশবিদও । তাঁরা শিখাচ্ছেন কী করে পরিবেশকে ভালবাসতে হয়, আর সেই ভালবাসার প্রতিদান পরিবেশ দেয় কীভাবে । তাঁদের লক্ষ্য মানুষের মনে পরিবেশের অনুরণন। তবু পরিবেশের প্রক্রিয়াগুলিকে মননশীলতার পরিচয় বলে না ভেবে অনেকে ভাবতে চান প্রাকৃতিক বিক্রিয়া হিসাবে । উপলব্ধি কথাটি তাঁদের পক্ষে অনেকটাই গুরুভার ।
ইতিহাস বলে মানুষ কিন্তু চিরকাল পরিবেশ সম্বন্ধে এতটা অচেতন ছিলনা । বৃহদারণ্যক উপনিষদের সেই বহু উচ্চারিত শ্লোক সবাই বহুবার শুনেছেন, । মধুবাতা ঋতায়তে মধুক্ষরন্তি সিন্ধবঃ মাধ্বীর্ণঃ সন্ত্বৌষধিঃ ... তার পরে আছে মন্ত্র । ব্রহ্মবিদ্যা শিখব বললেই শিক্ষা শুরু করা যায়না, তার উপযুক্ত সময় আছে, আর সেই অনুকূল সময়ের কথা যত সুন্দরভাবে আছে এদেশে, প্রায় ষাট হাজার বছর আগে পরিবেশ সচেতন্তা শুরু হলেও এমনভাবে আর কোথাও নেই । ষাটহাজার বছর আগে আগুনের নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার শুরু, ছ’ হাজার খ্রীস্টপূর্বে দক্ষিণ ইস্রায়েলের পতনের কারণ নির্বিচারে বনছেদন, ২৭০০ খ্রিস্টপুর্বে গিলগামেশ মহাকাব্য, ২৫০০ খ্রিস্টপূর্বে মোহেঞ্জোদারো, ১৩০০ খ্রিস্টপূর্বে মোজেজের অনুশাসন, এসব বিচার করেছেন পিথাগোরাস, পরে হেরোডোটাস, বিচার করেছেন প্রথমটি ছাড়া, এসেছে আচরণ বিধি । তবে অন্তরের অন্তঃকরণে প্রকৃতির ক্রিয়াশীলতার অনুরণন সেই উপলব্ধি । তবে সব পরিবেশবিদই যে সেই উপলব্ধি অনুসারে কাজ করেন তা ভাবার মত যথেষ্ট তথ্য এখনও অনেক দূরে । বরং পরিবেশকে সামনে রেখে আক্রমণাত্মক সক্রিয়তা অনেক বেশি স্পষ্ট ।
বর্তমান গ্রন্থটিরও লক্ষ্য এই অনুরণন, তাই পরিবেশ এখানে ‘প্রকৃতির জ্যেষ্ঠ সন্তান’। আমাদের সবার উচিত পরিবেশকে সেই সম্মান দেওয়া। তবেই পরিবেশ সুস্থ থেকে আমাদেরও সুস্থ রাখবে, আমাদের পরবর্তী প্রজন্মগুলিকেও আমাদের মত পরিচর্যা করবে । প্রকৃতির প্রথম সন্তান সেই উপলব্ধিতে পৌঁছে দেবার সামান্য প্রয়াস, আর সেই প্রয়াসকে ঠিকঠাক বুঝতে রসায়নবিদ্যা, পদার্থবিদ্যা আর জীববিদ্যার মামুলি জ্ঞান যথেষ্ট । তবে সংখ্যাবিদ্যা মাঝে মাঝে এসেছে যুক্তির হাত ধরে । যাঁরা এ ধরনের একটা রচনায় লেখককে একদা উৎসাহিত করতেন আজ তাঁদের কেউ নেই ! পরবর্তীকালে যাঁরা সেই কাজটা করেছেন, তাঁদের মধ্যে প্রথমেই আছেন শিশু সাহিত্য সংসদের কর্ণধার শ্রী দেবজ্যোতি দত্ত । তাঁকে এবং তাঁর সংস্থার অন্য অনেক কর্মী যাঁদের সক্রিয় সহযোগিতা ছাড়া বইটি দিনের আলো দেখত না তাঁদের কাছে লেখকের অপরিসীম কৃতজ্ঞতা ।
দীপংকর লাহিড়ী ।